আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
এক মৎস্য গ্রামেই রয়েছে প্রায় ৩০০ পুকুর। এসব পুকুরে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন গ্রামের প্রায় ৭০০ পরিবার। মাছ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে আরও দেড় হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। বছরে শত শত টন মাছ উৎপাদন করে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেচাকেনার মধ্য দিয়ে একসময়ের দরিদ্র এই জনপদের অর্থনীতিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সাফল্যের এই গল্প কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার হরিশ্বর তালুক গ্রামের। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত গ্রামটি কয়েক বছর আগেও ছিল ডোবা ও বিলবেষ্টিত। এখন সেই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে পুকুরের সারি। অধিকাংশ বাড়িই ঘেরা পুকুরে। পাকা সড়ক ধরে এগোলে বাড়তে থাকে পুকুরের সংখ্যা। কোনোটি ছোট, কোনোটি আবার বিশাল-দেখতে অনেকটা বিলের মতো।
মাছ চাষের নানা কাজে যুক্ত রয়েছেন নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে শিশুরাও। কেউ নৌকায় মাছের খাবার দিচ্ছেন, কেউ জাল টানছেন, আবার কেউ মাছ নিয়ে ছুটছেন আড়তের দিকে। মাছ চাষ করে অনেক পরিবার দারিদ্র্য কাটিয়ে এনেছে সচ্ছলতা। কেউ বাড়িতে তুলেছেন পাকা দালান, কেউ সন্তানদের পড়াচ্ছেন দূরের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই সঙ্গে সারা বছর কাজের সুযোগ পেয়েছেন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষও। শনিবার সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার হরিশ্বর তালুক গ্রামের প্রায় ৭০ শতাংশ পুকুর মূলত ধানি জমি। এসব জমিতে বছরে একবার বোরো ধান চাষ করা হয়। বছরের বাকি সময় সেখানে চলে মাছ চাষ। অন্য পুকুরগুলোতে সারা বছরই মাছ চাষ করা হয়। স্থানীয় চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই দশক ধরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন গ্রামের প্রায় ৭০০ মানুষ। তাদের হিসাবে, গ্রামে প্রায় ১০০টি বড়, ৭০টি মাঝারি ও ১৩০টি ছোট পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরে বছরে প্রায় ২ হাজার ৬৩৩ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি মাছ গড়ে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। তবে রাজারহাট উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডোবা ও অন্যান্য জলাশয় বাদে গ্রামে পুকুরের সংখ্যা ২১১টি। এসব পুকুরে বছরে প্রায় ৭০৩ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার হরিশ্বর তালুক গ্রামটি একসময় বিশাল একটি দোলা বা বিলের পাশে ছিল। লোকসংখ্যাও ছিল কম। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। ২০০০ সালে মোঃ ইলিয়াস আলী নামের এক ব্যক্তি প্রথম ধানি জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। তার সাফল্য দেখে অন্যরাও একই পদ্ধতিতে মাছ চাষে আগ্রহী হন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পুকুর ও মাছচাষির সংখ্যা। প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষিরা আধুনিক পদ্ধতি ও নিত্যনতুন কৌশল রপ্ত করতে থাকেন। এরপর শুরু হয় তাদের ভাগ্যবদলের যাত্রা। গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মাছচাষী মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের রয়েছে ২৯ একর জমির ওপর পাঁচটি বড় পুকুর। এর মধ্যে তিন একর জমি তার নিজের। বাকি জমি দুই বছরের জন্য প্রতি শতক ৩৫ টাকা হিসেবে লিজ নিয়েছেন তিনি। এসব পুকুরে তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ কার্পজাতীয় মাছ বেশি চাষ করেন। পাশাপাশি পাঙ্গাশ, পাবদা, গুলশা ও ট্যাংরার চাষও করেন। বর্তমানে তার বিনিয়োগ প্রায় ৬০ লাখ টাকা। বছরে প্রায় এক হাজার মণ মাছ উৎপাদন করেন তিনি। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা লাভ হয় বলে জানান জাহাঙ্গীর। সফল মাছচাষীদের মধ্যে রয়েছেন মোঃ শাহ আলম। তার ২৩ একর জমিতে রয়েছে তিনটি বড় পুকুর। এসব পুকুরে কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।
আরেক মাছচাষী মোঃ আবুল কালাম আজাদ বছরে এক কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘মাছ চাষ করে শুধু চাষিরাই লাভবান হচ্ছেন না। পুকুরের পাহারাদার, জেলে, ভ্যানচালক, মাছের খাবার ও ওষুধ সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এখানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।’ মাছচাষী মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় মৎস্য বিভাগের তেমন সহযোগিতা না পেলেও বিভিন্ন ফিড কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত এলাকায় আসেন এবং চাষিদের প্রশিক্ষণ দেন। এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা আধুনিক ও কার্যকর মাছ চাষের কৌশল শিখছেন। এতে মাছের রোগবালাই কমার পাশাপাশি দ্রুত বৃদ্ধি হচ্ছে এবং লাভও বাড়ছে। চাষপদ্ধতি সম্পর্কে মাছচাষী মোঃ আব্দুল জব্বার বলেন, কোম্পানির তৈরি খাবারের পাশাপাশি পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যও ব্যবহার করেন তারা। নালিগুড়, চিটাগুড়, খৈল ও ময়দাসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। পানি জীবাণুমুক্ত রাখতে চুন, লবণ, কীটনাশক ও সার ব্যবহার করেন। দূর-দূরান্ত থেকে মাছের রেণু সংগ্রহ করেন তারা, যাতে দ্রুত মাছের বৃদ্ধি ঘটে। এসব কৌশলই তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি লাভ বাড়াতে সহায়তা করছে। তবে মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন চাষি। বাঙালপাড়ার মাছচাষী মোঃ শাহীন পাটোয়ারি বলেন, গত ছয় মাসে প্রতি কেজি মাছের খাবারের দাম এক টাকা বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমে গেছে।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ এমদাদুল হক বলেন, রাজারহাট উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরে বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ উৎপাদন হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে হরিশ্বর তালুক গ্রামের চাষিরা সফল হয়েছেন। তাদের এই সাফল্য এখন পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে প্রশিক্ষণসহ মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে এ গ্রামের চাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন